বত্রিশতম অধ্যায় প্রস্থান
সব সময়ই তান লুন ছিলেন অত্যন্ত নিরব, তিনি যখন থেকে চেচিয়াংয়ে নিযুক্ত হয়েছেন, তখন থেকেই ‘অতিরিক্ত কোনো ঝামেলায় না জড়ানোই শ্রেয়’—এই নীতি মেনে চলেছেন। তিনি সচরাচর কারো সঙ্গে বিরোধে জড়ান না, এমনকি সভায়ও কোণায় বসে থাকেন, আলোচনায় অংশ নেন না।
এর কারণ খুব স্পষ্ট—এখানে যারা আছেন, তারা সবাই ইয়ান দলে’র সদস্য। চেচিয়াংয়ের গভর্নর ও তত্ত্বাবধায়ক হু জোংশিয়ান, ইয়ান সংয়ের ছাত্র; চেচিয়াংয়ের বিচারক হে মাওচাই এবং প্রশাসক ঝেং মিচাং, উভয়েই ইয়ান শিফান নামক তরুণ মন্ত্রীর লোক; উপরন্তু, তাদের প্রাসাদের সঙ্গেও রয়েছে দুর্বোধ্য সম্পর্ক।
আর স্বচ্ছ ধারার লোক বলতে এখানে শুধু তান লুনই আছেন।
এখন, তান লুন শুনলেন—ঝেং মিচাং তার শ্রদ্ধেয় সহকর্মীকে এমন অপমানজনক কথা বলছে, তিনি আর সহ্য করতে পারলেন না এবং সরাসরি প্রতিবাদ করলেন।
‘‘তুমি যদি সাহস থাকে, আগের কথাগুলো আবার বলো। আমি, তান লুন, অবশ্যই তোমার বিরুদ্ধে সম্রাটের কাছে অভিযোগ জানাব!’’
‘‘আমি তো বললামই, কী করবে? ওইসব ভণ্ড স্বচ্ছ ধারার লোক! এমনকি শু জিয়ের সামনে দাঁড়ালেও আমি এই কথাই বলতাম!’’
‘‘তুমি...!’’ তান লুন রাগে কাঁপতে লাগলেন, হাতা গুটিয়ে প্রতিপক্ষের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়তে উদ্যত হলেন।
‘‘এসো, ভয়ে কি আমি কাঁপছি নাকি?’’ ঝেং মিচাং নির্ভীকভাবে ব্যঙ্গ করল।
‘‘এবার থামো! এভাবে ঝগড়া করছো কেন? তোমাদের কি কোনো শিক্ষার ছাপ আছে? রাস্তায় থাকা বদমাশদের সঙ্গে তোমাদের কী পার্থক্য?’’
দেখা গেল, ঝগড়া আর একটু বাড়লেই দুইজনের মধ্যে মারামারি বেধে যাবে—তখন উপরে বসা হু জোংশিয়ান কথা বলে উত্তেজনা প্রশমিত করলেন।
‘‘হুম!’’
দুইজন একে অপরের দিকে তাকালেন; চোখের ভাষায় শুধুই ঘৃণা।
পরক্ষণেই তান লুন প্রথমে মাথা নিচু করে বেরিয়ে গেলেন। ঝেং মিচাং তান লুনের পেছন দিকে তাকিয়ে মাটিতে থুথু ফেলল, ফিসফিসিয়ে গালি দিল—‘‘কিছু একটা!’’
…
তাওইয়ুয়ান গ্রামের পথে, গাও হানওয়েন আবারো শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত সমস্ত ঘটনা শুনিয়ে দিলেন মা নিংয়ুয়ানকে।
শুনে মা নিংয়ুয়ান প্রচণ্ড রেগে গিয়ে হাত নেড়ে বললেন, ‘‘এইসব বেয়াড়া গ্রামবাসী!’’
‘‘আমার মনে হয়, এই গ্রামবাসীরা নিশ্চয়ই কোনো দুষ্কৃতিকারীর প্ররোচনায় উত্তেজিত হয়েছিল, তাই এমন মারাত্মক কাজ করে ফেলেছে—সৈন্যদের মেরে ফেলেছে। একটু পরে যখন আমরা সেখানে যাব, আশা করি আপনি নিরীহদের যেন ক্ষতি না করেন।’’
হাংজৌর রাজ্যপাল এভাবে উগ্র হয়ে উঠেছেন দেখে গাও হানওয়েন কিছুটা উদ্বিগ্ন হলেন এবং সদয়ভাবে অনুরোধ করলেন।
মা নিংয়ুয়ান গাও হানওয়েনের অনুরোধ শুনে হাসলেন, ‘‘দুশ্চিন্তা করবেন না, আমি সব বুঝে-শুনেই ব্যবস্থা নেব।’’
গাও হানওয়েন কোনো উত্তর না দিলে মা নিংয়ুয়ান আবার বললেন, ‘‘আপনি নিশ্চয়ই শুনেছেন—‘জনগণকে যা ইচ্ছা তাই করতে দাও, কিন্তু জানতে দিয়ো না’। আপনার দোষ, আপনি এদের খুব ভালোভাবে দেখেছেন, তাই তারা মাথায় উঠে বসেছে। চিন্তা করবেন না, আমি আপনাকে সুবিচার পাইয়ে দেব!’’
‘‘‘জনগণকে যা ইচ্ছা তাই করতে দাও, কিন্তু জানতে দিয়ো না’...’’ মা নিংয়ুয়ানের কথা শুনে গাও হানওয়েন গভীর চিন্তায় ডুবে গেলেন।
সৈন্যদের গতি খুব দ্রুত; কিছুক্ষণের মধ্যেই তারা পৌঁছে গেল সেই জায়গায়—তাওইয়ুয়ান গ্রাম।
‘‘স্যার, ওইদিকে দেখুন!’’ সামনে থাকা এক সৈন্য চিৎকার করে জানাল।
‘‘কী?’’ মা নিংয়ুয়ান কথা বলে সহকারীর কাছ থেকে দূরবীন নিলেন, যেদিকে সৈন্য দেখিয়েছিল, সেদিকে তাকালেন।
দেখলেন, গ্রামের কাছে এক বিশাল গাছের ডালে চার-পাঁচটি মৃতদেহ ঝুলছে। তাদের কাপড় খুলে নেওয়া হয়েছে, শরীরে নানা অপমানজনক কথা লেখা।
মা নিংয়ুয়ান রাগ চেপে রেখে দূরবীন নামিয়ে বললেন, ‘‘তাড়াতাড়ি এগিয়ে চলো!’’
অল্প সময়েই সৈন্যরা গ্রামের দ্বারে পৌঁছাল। গাছের ডালে ঝুলন্ত সহকর্মীদের দেখে তারা ক্ষোভে ফেটে পড়ল; কারও কারও চোখে পানি, কেউ মুখ ঢেকে কাঁদছে।
গাছে ঝুলন্ত এই লোকগুলো হয়তো আগের দিনও প্রাণবন্ত ছিল, বন্ধুদের সঙ্গে হাসিঠাট্টা করছিল, কোথায় মদ খাবে সেই ঠিক করছিল, কোন বাড়ির মেয়েটি সবচেয়ে সুন্দর—এসব নিয়ে গল্প করছিল। কে জানত, এমন অপমানজনকভাবে তাদের মৃত্যু হবে!
‘‘পুরো গ্রাম ঘেরাও করো, একটা মাছিও যেন বেরোতে না পারে,’’ মা নিংয়ুয়ান কঠোর নির্দেশ দিলেন।
‘‘ঠিক আছে!’’ সৈন্যরা আজ্ঞা মানল, গ্রাম ঘিরে ফেলল, তারপর বাড়ি-বাড়ি গিয়ে খুঁজতে লাগল।
এ সময় গাছে ঝুলন্ত মৃতদেহগুলোও নামিয়ে আনা হলো, সারিবদ্ধভাবে শোয়ানো হলো।
গাও হানওয়েন এইসব সৈন্যদের দিকে তাকালেন, যারা জীবন দিয়ে তাকে পালাতে সাহায্য করেছিল। তিনি অনেকক্ষণ নির্বাক হয়ে রইলেন, তারপর ধীরে ধীরে এগিয়ে গিয়ে মৃতদেহগুলোর সামনে হাঁটু গেড়ে বসে ফিসফিস করে কিছু বলতে লাগলেন।
‘‘স্যার, গ্রামে একজন লোকও নেই!’’ কয়েকজন সৈন্য খুঁজে ফিরে এসে জানাল।
‘‘হুঁ, এই বেয়াড়া গ্রামবাসীরা বেশ চালাক, জানে তাদের অপরাধ ছোট নয়। এ আশেপাশে খোঁজো, আমাদের ভাইদের প্রতিশোধ নিতে হবে!’’ মা নিংয়ুয়ান হিংস্র হাসি দিয়ে নির্দেশ দিলেন।
‘‘ঠিক আছে।’’ সৈন্যরা বেরিয়ে গিয়ে আশেপাশে খুঁজতে লাগল।
‘‘এখানকার মানচিত্রটা দাও তো।’’
সহকারীর কাছ থেকে মানচিত্র নিয়ে মা নিংয়ুয়ান ভালো করে দেখে বুঝলেন, আশেপাশে লুকানোর কোনো জায়গা নেই।
‘‘স্যার, চারপাশ খুঁজে দেখেছি, কাউকে পাইনি।’’
‘‘আমাদের দিকেও কেউ নেই!’’
মা নিংয়ুয়ান কপাল কুঁচকে ভাবতে লাগলেন, গ্রামবাসীরা কোথায় লুকাতে পারে সেটা নিয়ে হিসাব-নিকাশ করলেন।
‘‘মা সাহেব, আমার জানা মতে, আশেপাশে এমন কোনো জায়গা নেই যেখানে লুকানো যায়। হতে পারে গ্রামের লোকজন আদৌ লুকায়নি,’’ গাও হানওয়েন শোক শেষ করে স্বাভাবিক স্বরে বললেন।
‘‘তুমি কী বলতে চাও?’’
‘‘ঠিক তাই, আমার ধারণা—গ্রামবাসীরা লুকায়নি। শুরু থেকেই ওদের লক্ষ্য ছিল নিজেদের জমি রক্ষা করা। হয়তো ওরা এই মুহূর্তে জমির কাছেই পাহারা দিচ্ছে।’’ গাও হানওয়েন মানচিত্রে তাওইয়ুয়ান গ্রামের কৃষিজমির অবস্থান দেখালেন।
‘‘খুব যুক্তিসঙ্গত, তুমি তো সত্যি ছোট মন্ত্রীর শিষ্য! আমি কেমন করে ভাবিনি?’’ মা নিংয়ুয়ান খুশিতে মাথায় হাত চাপড়ালেন।
‘‘সব সৈন্য শুনো—লক্ষ্য তাওইয়ুয়ান গ্রামের কৃষিজমি, এগিয়ে চলো!’’
‘‘ঠিক আছে!’’
…
তাওইয়ুয়ান গ্রামের কৃষিজমি গ্রামের থেকে দুই কিলোমিটারেরও কম দূরে। এ সময় পুরো গ্রামের লোক সেখানে জড়ো হয়েছে; বৃদ্ধ, নারী, শিশু সবাই বাইরের দিকে বিশ্রাম নিচ্ছে, শক্তপোক্ত যুবকরা একত্র হয়ে করণীয় ঠিক করছে।
‘‘এখন কী হবে? আমরা তো সরকারি লোক মেরে ফেলেছি, বড় বিপদ! অল্প সময়েই সৈন্য এসে পড়বে।’’
‘‘কিসের ভয়? আমাদের তো এত লোক! দরকার পড়লে প্রাণ দিয়ে লড়ব। আমার জমি নিতে হলে, আমার মৃতদেহ পেরিয়ে যেতে হবে।’’
‘‘ঠিক, লড়াই করব!’’
‘‘ওদের তো অনেক সৈন্য, আমাদের মধ্যে এত বৃদ্ধ, শিশু, অসুস্থ লোক আছে—লড়ব কীভাবে? বোকা নাকি?’’
‘‘সব দোষ দানিউর! সে-ই বলল, সরকার আমাদের জমি কেড়ে নেবে। নইলে আমরা এত উচ্ছ্বসিত হতাম না।’’
‘‘ঠিক বলেছ, সব দোষ দানিউর। ও না হলে আজ আমাকে পালিয়ে আসতে হতো না।’’
এভাবে সবাই কথা কাটাকাটি করল, কিন্তু কোনো কার্যকর উপায় বের করতে পারল না। শেষে সবার দৃষ্টি পড়ল বড় গাছের নিচে ঘুমিয়ে থাকা দানিউর দিকে।
দানিউর আসল নাম ঝাং দানিউ, তাওইয়ুয়ান গ্রামের লোক। সে গ্রামের হাতে গোনা কয়েকজন শিক্ষিত মানুষের একজন; সৈন্যদের মৃতদেহে অপমানসূচক লেখাগুলো তারই লেখা।
ওই দানিউই গ্রামবাসীদের জানিয়েছিল—সরকার জমি মাপার অজুহাতে তাদের জমি কেড়ে নিতে চাইছে। তারই আহ্বানে গ্রামের লোকজন বিদ্রোহে অংশ নেয়।
‘‘চলো, দানিউকে বেঁধে দিই, সরকারের হাতে তুলে দিই, তাহলে আমাদের দণ্ড মাফ হতে পারে।’’
‘‘আমি মনে করি, এটাই ভালো; একজনের বিপরীতে সবাইকে কেন শাস্তি পেতে হবে?’’
‘‘আমার ছেলেটা তো কদিন হলো জন্মেছে, ওর বাবা ছাড়া চলবে কীভাবে?’’
‘‘আমার তো আশি বছরের মা বেঁচে আছে, তাকেও দেখাশোনা করতে হবে।’’
…
অল্প সময়েই সবাই একমত হয়ে, ঘুমন্ত দানিউকে বেঁধে ফেলল।
ঝাং দানিউ হঠাৎ ঘুম ভেঙে চমকে উঠে চেঁচিয়ে বলল, ‘‘তোমরা কী করছ? ছেড়ে দাও আমাকে!’’
‘‘ক্ষমা করো দানিউ, তোমার একটু আত্মত্যাগ করতে হবে, না হলে আমাদের সবার সর্বনাশ হবে।’’
এই কথা শুনে ঝাং দানিউর চোখে হতাশার ছাপ ফুটে উঠল।